উইনি-তো-পু

লেখা এ-এ-মিলনে, ছবি ই-এইচ-শেপার্ড

মা'কে
হাতে হাত ধরে আসি
ক্রিস্টফার আর আমি
বইটা তোমায় দিতে।
তুমি কি চমকে গেছ?
তোমার লেগেছে ভালো?
এটাই চাইতে তুমি?
তাহলে তোমারি এটা!
কারণ আমরা তোমাকেই ভালোবাসি।

ভূমিকা

তুমি হয়তো ক্রিস্টফার রবিনের ব্যাপারে আগে অন্য একটা বই পড়েছিলে, তাহলে তোমার হয়তো মনে আছে যে ওর একটা রাজহাঁস ছিল (বা হতে পারে রাজহাঁসের ক্রিস্টফার রবিন ছিল, ঠিক মনে পড়ে না) আর সেই রাজহাঁসকে ক্রিস্টফার পু বলে ডাকতো। সে অনেক দিন আগের কথা, তারপর তাকে আমরা টাটা বলেছিলাম, কিন্তু নামটা আমাদের সঙ্গেই রেখে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম রাজহাঁসের নিশ্চই আর সে নামের প্রয়োজন পড়বে না। তারপরে একদিন এডয়ার্ড ভালু যখন বলল ওরও একটা যমকালো নাম চাই, ক্রিস্টফার রবিন এক কথায়, নির্দ্বিধায়, এক মুহূর্তের জন্যও না ভেবে, নাম দিয়ে দিল উইনি-তো-পু। ব্যাস, হয়ে গেল। এটা হল পু নামকরণের বৃত্তান্ত, এবার বাকিটাও বলি।

লণ্ডনে থাকলে চিড়িয়াখানায় তো যেতেই হয়। কিছু লোক আছে যারা চিড়িয়াখানায় গিয়ে শুরু থেকে শুরু করে, প্রবেশপথ ধরে ঢোকে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবকটা খাঁচা ঘুরে প্রস্থানপথ ধরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যারা ভালো, তারা এক ছুটে তাদের নিজেদের পছন্দের পশুর কাছে চলে যায়, আর সারাদিন সেখানেই থাকে। তাই ক্রিস্টফার রবিন চিড়িয়াখানায় গেলে সোজা যায় মেরুভালুকের কাছে, ফিসফিস করে তার চেনা এক পশুপালকের (বাঁদিক থেকে তৃতীয়জন) কানে কানে কিছু বলে, একটা লুকোনো দরজা খুলে যায়, আমরা অন্ধকার সুড়ঙ্গ আর লম্বা সিঁড়ি পেরিয়ে একটা বিশেষ খাঁচার কাছে চলে আসি, সেই খাঁচার দরজাও খুলে যায়, বেরিয়ে আসে ক্রিস্টফারের লোমশ খয়েরী বন্ধু, আর "ভালু" বলে এক ছুটে ক্রিস্টফার জড়িয়ে ধরে তাকে। এবার এই ভালুটার নামও উইনি (যাতে প্রমাণ হয় ভাল্লুকদের জন্য উইনি কি চমৎকার একটা নাম), কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল কি, আমাদের ঠিক মনে নেই উইনির থেকে পু-র নামকরণ হয়েছে, না পু-র থেকে উইনির। কোনো এক কালে জানতাম, এখন ভুলে গেছি।

এত অবধি লিখেছি, তখনি হঠাৎ শুয়োছানা সরু গলায় শুধোলো, "আর আমি?" "ওরে আমার শুয়োছানা," আমি বললাম, "পুরো বইটাই তো তোকে নিয়ে।" "না, এটা তো পু-কে নিয়ে," উত্তর আসে। বোঝো কাণ্ড। শুয়োছানার রাগ হয়েছে কারণ পু-র জন্য এতটা ভূমিকা লিখেছি যে। পু অবশ্যই প্রিয়তম, নিঃসন্দেহে, কিন্তু শুয়োছানারও নিজস্ব কিছু স্থান আছে, যেখানে পু যেতে পারে না; যেমন পু-কে নিয়ে তো আর স্কুলে যাওয়া যায় না, কিন্তু শুয়োছানা এতটাই ছোটো যে টুক করে পকেটে ঢুকে যায়, আর যখন ক্রিস্টফার রবিন ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারে না সাত দুগুণে বারো না বাইশ, তখন পকেটের ওপর দিয়ে শুয়োছানাকে হাত বুলিয়ে আদর করতে বেশ লাগে। মাঝেমধ্যে শুয়োছানা পকেট থেকে মুখ বার করে দোয়াতে মুখ দেয়, আর এ ভাবেই শুয়োছানার পু-র থেকে ঢের বেশি শিক্ষালাভ হয়েছে, অবশ্য পু তাতে দুঃখ পায় না। কিছু লোকের বুদ্ধি আছে, কিছু লোকের নেই, সে বলে, ব্যাস এতটাই।

এখন দেখি বাকিরাও বলতে শুরু করেছে, "আর আমরা, আমাদের কী হবে?" তাহলে বোধ করি আর ভূমিকা না লিখে এবার আসল গল্প লেখা যাক।

সূচী

পর্ব ১

যেখানে উইনি-তো-পু-র সাথে আমাদের প্রথম আলাপ, কিছু মৌমাছি, আর গল্পের শুরু

এই যে উইনি-তো-পু, ক্রিস্টফার রবিনের সাথে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, মাথাটা সিঁড়িতে লাগছে ধুপ্, ধাপ্, ধপাস্। ওর যতদূর ধারণা, সিঁড়ি দিয়ে নামার এটাই একমাত্র উপায়, কিন্তু তবুও কেন জানি না মনে হয় অন্য কোনো উপায়ও থাকতে পারে, শুধু একবার যদি মাথা বাঁচিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবা যেত। তারপর আবার ভাবে, না হয়তো সত্যিই আর কোনো উপায় নেই। যাই হোক, এই সে পৌঁছে গেছে একতলায়, তোমাদের সাথে আলাপ করিয়ে দি এবার, উইনি-তো-পু।

আমি যখন প্রথমবার ওর নাম শুনলাম, আমি বললাম (ঠিক যেমন তুমিও ভাবছো), "কিন্তু আমার তো ধারণা ছিল ও একটা ছেলে?"

"ঠিক তাই," বলে ক্রিস্টফার রবিন।

"তাহলে উইনি নাম কী করে হল? ওটা তো মেয়েদের নাম।"

"ওর নাম তো উইনি নয়।"

"কিন্তু তুই তো বললি——"

" ওর নাম উইনি-তো-পু। তুমি 'তো' মানে জানো না?"

"ওহো হ্যাঁ, এবার বুঝেছি," আমি তাড়াতাড়ি উত্তর দি। আশা রাখি তুমিও বুঝেছ, কারণ এ ব্যাপারে এর বেশি বোঝাতে পারবো না।

কিছু কিছু দিন উইনি-তো-পু একতলায় এসে দাবা বা লুডো খেলতে চায়, আর অন্য দিনগুলোতে চুপ করে আগুনের সামনে বসে থাকে, গল্প শুনতে চায়। আজ সন্ধ্যেবেলায়——

"একটা গল্প হবে কি?" ক্রিস্টফার রবিন প্রশ্ন করে।

"হবে কি? কী রকম গল্প?" আমি উত্তর দি।

"তুমি কি উইনি-তো-পু-কে একটা মিষ্টি গল্প বলতে পারবে?"

"হয়তো," আমি বলি। "ওর কেমন গল্প ওর ভালো লাগে?"

"নিজের ব্যাপারের গল্প ভালো লাগে, ও ওরকমই।"

"ও আচ্ছা।"

"তো বলতে পারবে, একটা মিষ্টি গল্প?"

"চেষ্টা করতে পারি," আমি বলি।

তাই চেষ্টা করলাম।

অনেক অনেক কাল আগে, এই ধরো গত শুক্রবার, স্যাণ্ডার্স নাম নিয়ে উইনি-তো-পু একটা প্রকাণ্ড অরণ্যে থাকত।